ফন্ট বাছাইয়ের আগে যে বিষয়গুলো জানা দরকার

অনেকেরই কাছে সবচেয়ে ভালো ফন্ট নির্বাচন করার ব্যাপারটা খুব ঝামেলাপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক ডিজাইনার উপযুক্ত ফন্ট নির্বাচন করতে না পেরে শেষে গড়িমসি করে একটা ফন্ট দিয়ে কাজ সেরে ফেলেন। কিন্তু বহির্বিশ্বের অন্যান্য গ্রাফিক ডিজাইনারদের সাথে তাল মিলিয়ে ফন্ট নির্বাচন করতে পারলে এই কাজটি অনেকাংশেই সোজা হয়ে যায়। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় ফন্ট বোল্ড হবে না আন্ডারলাইনড হবে নাকি লাইট হবে – এ নিয়ে দ্বিধার সৃষ্টি হয়। কারণ প্রফেশনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি ভালো ফন্ট বাছাই করতে পারাটাও একজন ডিজাইনারের একটি অন্যতম দক্ষতা। নিচে কিছু ফন্ট বাছাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হলো। এই আর্টিকেল পড়ার পর ফন্ট নিয়ে আর কোনো জটিলতা সৃষ্টি হবে না আশা করা যায়!

ফন্ট বাছাইয়ের আগে যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা অতি জরুরিঃ

  • লক্ষ্য
  • ডেমোগ্রাফিক্স
  • সহজবোধ্যতা
  • সেরিফ নাকি স্যানস
  • ফন্ট ফ্যামিলি সাইজ
  • বিশেষ বৈশিষ্ট্য
  • প্রিন্ট, ওয়েব নাকি অন্য মিডিয়া

১। লক্ষ্যঃ

যেকোনো কাজ করার আগে যেমন লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয় তেমন একটি ফন্ট নির্বাচন করার আগেও বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়। এই বিষয়টি যেমন নিজ প্রফেশনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে করতে হয় তেমনি ক্লায়েন্ট বা অডিয়েন্সের পছন্দের ব্যাপারটিও মাথায় রাখা উচিত। অডিয়েন্স বা ক্লায়েন্ট যাতে ফন্টের সাথে সম্পর্কিত ব্রসিউর বা বিজনেস কার্ডটি দেখে সম্পূর্ণ তথ্য বুঝতে পারেন সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাই শুধু স্টাইলিশ ফন্ট নির্বাচন করলেই যে তা ক্লায়েন্টের ভালো লাগবে তা না! একটা অতি সাধারণ ফন্ট দিয়েও অনেক ভালো ইম্প্রেশন তৈরি করা যায় – একথাটা মনে রাখতে হবে!

fonts-1_0

 

২। ডেমোগ্রাফিক্সঃ

ডেমোগ্রাফিক্স শব্দটা কেমন কাঠখোট্টা আর কঠিন তাই না! আসলে আমার অডিয়েন্স কে – এই বিষয়টি বুঝতে পারলেই ডেমোগ্রাফিক্স সম্পর্কে ভালো আইডিয়া হয়ে যাবে। ধরুন, আপনি কোনো পণ্য বিপণন করতে চাচ্ছেন। এবার পণ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ফন্ট নির্বাচন করুন যাতে এই পণ্যের ক্রেতা সহজেই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সেই পণ্যটির প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন, কিনতে চান। এক্ষেত্রে বাচ্চাদের শিক্ষণীয় বইয়ের কথা ধরা যাক। যেহেতু বইটি শিশুদের কথা চিন্তা করে তৈরি করা হচ্ছে সেহেতু এই বইয়ের ফন্টগুলো এমনভাবে বাছাই করা উচিত যাতে একজন অল্পবয়সী পাঠকের সেই বইয়ের লেখা বুঝতে কোনো কষ্ট না হয়। ফন্টগুলো আকর্ষণীয় হয় এবং সে পড়েও আনন্দ পায় – এমন ফন্ট বাছাই করতে হবে এক্ষেত্রে।

children

৩। সহজবোধ্যতাঃ

ফন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে সহজবোধ্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক ফন্ট আছে যেগুলো একটি বিশেষ মেসেজ বা তথ্য দেয়ার জন্য তৈরি করা হয়ে থাকে। আবার অনেক ফন্ট আছে যেগুলো শুধু গ্রাহকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই ডিজাইন করা হয়। ফন্টের সহজবোধ্যতার উপরই একজন পাঠকের সেই লেখার প্রতি নিবিষ্টতা, দৃষ্টিগ্রাহ্যতা, আকর্ষণ প্রভৃতি বিষয় নির্ভর করে। সহজবোধ্যতার সাথে আরও যে বিষয়টি চলে আসে সেটি হপচ্ছে পড়ার যোগ্যতা। কারণ এই সহজবোধ্যতার ব্যাপারটি যতবেশি পজিটিভ হবে পড়ার যোগ্যতাও তত আশাব্যঞ্জক হবে।

প্রথমেই কোনো ফন্ট সহজবোধ্যতার চিন্তা করে তৈরি করা হয় না। কারণ অনেক ফন্ট আছে যা ডিজাইন করা হয় বিশেষ কোনো অনুভূতি বা বিবৃতি প্রকাশ করার জন্য। তাই কোনো ফন্টের সহজবোধ্যতা আর পড়ার যোগ্যতার মধ্যকার সেতুবন্ধন করতে পারাটা একজন দক্ষ ডিজাইনারের মূল দায়িত্ব।

Good-typography-the-right-fonts

৪। সেরিফ নাকি স্যানসঃ

অনেকেই মনে করেন কোনো দীর্ঘ লেখার জন্য স্যানস সেরিফের তুলনায় সেরিফ ফন্ট বেশি গ্রহণযোগ্য। তবে এক্ষেত্রে ফন্ট সাইজ ছোট হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে এটা সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য কোনো নিয়ম না। কারণ এক্ষেত্রে আরও বেশ কিছু নিয়ামক আছে যেগুলো অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। যেমন এই লেখাটি কোথায় প্রকাশিত হচ্ছে – ওয়েব নাকি প্রিন্ট মিডিয়ায়, ডিজাইনের বৈশিষ্ট্য, সহজবোধ্যতা, পাঠকের রুচি প্রভৃতি বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

bdd8b232871546a5ac291ee985dc197e

৫। ফন্ট ফ্যামিলি সাইজঃ

সঠিক ফন্ট ফ্যামিলি সাইজ নির্ধারণ করাও একজন ডিজাইনারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ধরা যাক, কোনো আর্টিকেলের হেডলাইন ফুটিয়ে তুলতে হেলভেটিকার বোল্ড আর ইটালিক মিডিয়াম ফন্ট প্রয়োজন। আর অনুচ্ছেদটি লিখতে গ্যারামন্ডের ছোট এবং নরমাল লাইট ফন্ট প্রয়োজন। এক্ষেত্রে এই দুই ফন্টের সাইজ এবং ধরণের কথা চিন্তা করে ফন্ট সাইজ নির্ধারণ করতে পারলে কোন লেখাটি পাঠকের কাছে আরও দৃষ্টিগ্রাহ্য এবং আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

helvetica-bold-italic

৬। বিশেষ বৈশিষ্ট্যঃ

অনেক প্রজেক্টের বেলায় বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ফন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে এটা হতে পারে সেই ফন্টে স্মল ক্যাপসের ব্যবহার, মাল্টিপল ফিগার স্টাইল, ফ্র্যাকশন প্রভৃতি। ইদানিং ওপেনটাইপ ফন্টস এসব বৈশিষ্ট্য নিয়ে রিলিজ পেয়েছে। প্রজেক্টকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে এই ফন্টসের ব্যবহার করা যেতে পারে।

5290-opentype-fonts-fig0

৭। প্রিন্ট, ওয়েব নাকি অন্য মিডিয়াঃ

সব ফন্ট সব মিডিয়ায় অ্যাক্সেসেবল নাও হতে পারে। একজন ডিজাইনার তার প্রজেক্টে পছন্দমতো অনেক ফন্টের ব্যবহার করতে পারেন। যদি এটি শুধু প্রিন্ট মিডিয়ার জন্য তৈরি করা হয় তবে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এই প্রজেক্টটি যদি ওয়েবের জন্য অর্থাৎ ই-বুক, স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা অন্য কোনো ওয়েব মিডিয়ার জন্য তৈরি করা হয়ে থাকে তবে যত্রতত্র ফন্ট ব্যবহার করা উচিত হবে না।

RELIC

সৃজনশীল ফন্ট ডিজাইন করা একদিক থেকে যেমন খুব সহজ আবার খুব কঠিনও বটে। সৃজনশীল চিন্তাভাবনার পাশাপাশি অন্যান্য সকল ফন্ট সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখা, প্রতিদিন নতুন নতুন রিলিজ পাওয়া ফন্টগুলোর খোঁজখবর রাখা, টাইপোগ্রাফি সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান, ভেক্টর গ্রাফিক্স (যেমনঃ অ্যাডোব ইলাস্ট্রেটর, ইঙ্কস্কেপ) নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা, ফন্ট তৈরিতে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার (ফন্টল্যাব স্টুডিও, ফন্টর্ফোজ, ফন্ট ক্রিয়েটর, ভোল্ট) সম্পর্কে আইডিয়া রাখা এবং এসব প্লাটফর্মে কাজ করার অভিজ্ঞতা প্রভৃতি দক্ষতা রাখা জরুরি।

একজন ডিজাইনার একটি ফন্ট ডিজাইনের মাধ্যমে শুধু একটি নির্দিষ্ট ভাষার কিছু ভিন্নমাত্রার হরফের জন্ম দেন না বরং সেই ভাষার সাথে জড়িত সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটান। তাই ডিজাইনের পূর্বে একটি সুনির্দিষ্ট প্ল্যানমাফিক ড্র্যাফট করে, প্রচলিত কিন্তু বহুল ব্যবহৃত ফন্টগুলো সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রেখে ফন্ট ডিজাইন করতে পারলে সেই ফন্ট অবশ্যই প্রচুর গ্রহণযোগ্যতা পাবে। আর এখানেই একজন ডিজাইনারের সার্থকতা!

 

 

Category:

ব্লগ

Tags:

,

ফেইসবুকের সাহায্যে মন্তব্য দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.